প্রেমিকা বা প্রেমিক নেই! তবু কেন ভ্যালেন্টাইন ডাকে

একা না থাকা— সঙ্গী বা সঙ্গিনী থাকাটা আবশ্যিকই শুধু নয়, না থাকাটা লজ্জাজনক এবং গভীর অযোগ্যতার পরিচায়ক— এই অমোঘ সামাজিক চাপ দুর্নিবার্য হয়ে উঠল কেন অতি সাম্প্রতিক কালে— এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা বোধহয় প্রয়োজন।

সোশ্যাল মিডিয়া এবং বাস্তব জগতে বর্তমান সপ্তাহটি অতি বিশিষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। একই সঙ্গে, আমাদের কালে এসব প্রদর্শনমুখী ভালোবাসা ছিল না— ইত্যাকার বক্তব্য রাখা, কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্তের মতো মুখভাব-নৈষ্ঠিকদের সংখ্যাও খুব একটা কম তা-ও বলা যায় না। ওহো সরস্বতী পূজো! সরস্বতী পূজা আহা!— এমত হা হুতাশ ও প্রভূত কর্ণগোচর বই কি। ভালোবাসার নামে যৌবন লুঠ হয়ে যাচ্ছে পণ্যের বাজারে— পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লবী এই স্বরও কান পাতলেই শোনা যাবে, তথ্য-প্রমাণ ও দৃশ্য-সহ। ভালোবাসা-পুলিশ ও নীতি-পুলিশের দাপাদাপি ও দৃষ্টিগোচর। ফলতঃ এসব প্রসঙ্গ থাক – যোগ করার মতো নতুন কোনো মাত্রা বাকি নেই।

প্রাসঙ্গিকতা কি অন্যত্র তাহলে? একা না থাকা— সঙ্গী বা সঙ্গিনী থাকাটা আবশ্যিকই শুধু নয়, না থাকাটা লজ্জাজনক এবং গভীর অযোগ্যতার পরিচায়ক— এই অমোঘ সামাজিক চাপ দুর্নিবার্য হয়ে উঠল কেন অতি সাম্প্রতিক কালে— এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা বোধহয় প্রয়োজন। বাঙালি সমাজে (সমগ্র ভারতীয় সমাজেই সাধারণভাবে) প্রেমের আবেদন বিগত কয়েক শতাব্দীর। জাতি সৃষ্টির সময় থেকেই বলা যায়। সাহসী ও খোলামেলা ভালোবাসাও ভারতীয় সংস্কৃতির ই অঙ্গ— খাজুরাহো, কোণার্ক ইত্যাদি মন্দির-সৌধগুলির গায়ে শৈল্পিক কারুকাজ, বা সংস্কৃত সাহিত্য এবং সান্ধ্যভাষার সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যর প্রধান উপাদান এবং তার প্রকাশ ভঙ্গিই তার প্রমাণ। অধিক আলোচনা এ বিষয়ে নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু সাথী না থাকলে সম্মান নেই— এই ধারণার সর্বব্যাপিতা এভাবে আগে কোনোদিন মান্যতা পায়নি। এ কি তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যবিত্ত মানসিকতার নিবৃত্তিমার্গী পাপবোধের থেকে মুক্তির হঠাৎ বিস্ফোরণ? এই অতিসরলীকরণের রাস্তায় হাঁটলে গন্তব্য গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

মহাকাশবিজ্ঞানের গবেষণা কার্য উপলক্ষে আমেরিকায় যাওয়ার আগে, সাধারণ আমেরিকানদের বিভিন্ন কারণে হাসির পাত্র বলে ভাবতে শিখেছিলাম— শেখানো হয়েছিল বললেই হয়তো সঠিক বলা হয়। প্রধান যে কয়েকটি বিষয়ে উন্নাসিকতা তৈরি হয়েছিল আমার, সেটা তাদের পোষ্যপ্রেম (`মানুষ খেতে পায় না আর এরা কুকুরকে খাওয়ায়!), শারীরিক সুস্থতা সংক্রান্ত খুঁতখুঁতানি প্রায় বাতিকের পর্যায়ে চলে যাওয়া, টাকাপয়সা বিষয়ে প্রায় শাইলক সদৃশ্য মনোভাব (দেয়ার ইজ নো ফ্রি মিল আপ্তবাক্যটিকে তো এক সময়ে যথেষ্ট ঘৃণার চোখে দেখতাম), এবং ‘আমরা দু’জন বাকিরা কুজন’— এই জোড়বাঁধা মার্কিনি সামাজিক ব্যবস্থার জড়তা ও সংবেদনশীলতার অভাব নিয়ে এক কালে গলার শির ফুলিয়ে কম চেঁচাইনি।

২০০২ এর ক্রিসমাস, লস এঞ্জেলেসের শহরতলির এক বাসস্ট্যান্ডে বসে আছি হিমেল সন্ধ্যায়— পোস্টডক্টরাল মেন্টর এর বাড়িতে পরের দিন নিমন্ত্রণ। তাই বেছেগুছে ভালো ওয়াইন কিনতে এসেছি ডাউনটাউন এর এই দোকানে— ক্লোজ-আউট সেল দেবে খবর ছিল। প্রায় অমূল্য শার্দ্যণে পেয়ে গেছি দু বোতল অত্যন্ত শস্তায়, প্রফুল্ল মনে বাড়ি ফেরার বাস এর অপেক্ষা এখন। আমেরিকায় (ইউরোপেও) ক্রিসমাস মূলত পারিবারিক উৎসব, আমাদের দুর্গাপুজোর মতো হৈহৈ করে পাড়া বেড়াতে বেরোনোর নয়। ফলত রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ ফাঁকা— মাঝে মাঝে আলোর রেখা এঁকে সগর্জনে ছুটে যাচ্ছে দু একটি মোটরগাড়ি, বাস চলাচল ও লক্ষণীয় ভাবে কম।

সামনের এক দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা। ৮০-র কম বয়েস হবে না। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। ঝুঁকে পড়েছেন গ্রোসারি ভর্তি ভারী ব্যাগ বইতে গিয়ে— স্খলিত চরণে পা টেনে টেনে এগিয়ে চলেছেন বেশ দূরে পার্কিং প্লেস এর দিকে।

এঁর ক্রিসমাস নেই?

হৃদয়ের ফাঁদ ওর ফাঁদের হৃদয়! ছবি: পিক্সঅ্যাবে

উঠে যাই। ভারতীয় গ্রাম্য যুবক— বৃদ্ধাকে ভার টানতে দেখলে সাহায্য করা উচিত, মধ্যযুগীয় অব্যবহারিক বোধচালিত। গিয়ে ডাকি— ব্যাগগুলো দিন দেখি মাসিমা! প্রচণ্ড থতমত খেয়ে বৃদ্ধা সজোরে আঁকড়ে ধরেন মালপত্র। মাগিং এর আতঙ্কে, স্বভাবতই। ইউসিএলএ (UCLA – University of California at Los Angeles) এর স-ছবি পরিচিতি পত্র দেখিয়ে ওঁকে আস্বস্ত করি— ছিনতাইকারী নই। বোঝাই। ওঁর বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগে বুঝতে। দামড়া এক যুবক সঙ্গিনীবিহীন আজকের সন্ধ্যায়— এক খুনখুনে বুড়ির বাজারের ব্যাগ টেনে দিতে চায় এসে— এই অবাস্তব ব্যাপার জগতে সম্ভব! এতে ধাতস্ত হতে বেশ সময় লেগে যায় ওঁর। পরিশেষে ওঁর বিশ্বাস অর্জন করে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসা গেল। টুকটাক গল্প হয় কিছু— চরম নিঃসঙ্গতার সেই একই ছবি— পাশ্চাত্যজগৎময় যা স্বতঃসিদ্ধ। ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরি— স্বভূমিতে ঠাকুমা থাকলে দুর্গাপূজার দিন এই অবস্থা হতো কি তাঁর? নঞর্থক উত্তর পেয়ে (নিজের মনের কাছেই) আশ্বস্ত বোধ করি। যদিও আজ, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, সেই স্বস্তির বিন্দুমাত্র ও অবশিষ্ট রাখেনি চারপাশের আত্মবাদী সমাজ।

সেই আমার প্রথম `ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’।

আমার আমেরিকান পোস্টডক্টরাল মেন্টরএর স্ত্রী (ফরাসি মহিলা, তিনিও UCLA -রই অধ্যাপিকা। মানবিকবিদ্যার একটি শাখায়) অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভাবে আমাকে একদিন জানিয়েছিলেন, তাঁর মেয়ে এখনো মা বাবার সঙ্গে নিমন্ত্রণ রাখতে যায়। সচমকে জানতে চাই, তাতে দোষ টা কোথায়? উনি কপাল চাপড়ে সাতিশয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন— মেয়েটির (আমার থেকে বছর দশেকের ছোট বয়েসে, আমার ভীষণ ভাল বন্ধু ছিল) এখনও একজন স্টেডি বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে উঠতে পারেনি— রাত্রে বাড়ি ফিরে আসে, কখনো বা সন্ধ্যাগুলো বাড়িতেই থাকে। এভাবেই পর পর কালচারাল শক খেতে খেতে আমি ক্রমশ পাশ্চাত্য সমাজের গভীরে ঢুকে পড়তে থাকি। পরবর্তীকালে দীর্ঘ সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাটিয়েও একই অভিজ্ঞতা হয়— শুধু রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপ ছাড়া। মা অথবা শাশুড়ি এসে বাচ্চা সামলাচ্ছেন— এরকম উদাহরণ অধ্যাপিকা ও বৈজ্ঞানিক পোলিশ বান্ধবীর সংসারে দেখেছি। রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে সামাজিক আসঞ্জন, পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় প্রীতিকর ভাবে বেশি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিছুটা এমনই।

তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল? বাড়ি ফিরে এসে মুখ দেখার মতো বন্ধু বা বন্ধুনি না থাকলে বাকি পড়ে থাকে বেড়াল বা কুকুর বা কচ্ছপ বা গুবরে পোকা (গুবরে পোকা, সাদা ইঁদুর প্রভৃতি পোষ্য হিসেবে সাতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ওদেশে)— কথা বলা না যাক, আওয়াজ শোনা তো যাবে অন্তত— মনে হবে কেউ একজন আছে সঙ্গে। শরীর ভাল রাখতেই হবে, কারণ চিকিৎসার প্রবল খরচ এবং অসুস্থ হলে মুখে জলটুকু দেওয়ার মানুষ না মেলার সম্ভাবনাই প্রবল। শাইলক-বৃত্তিও সম্ভবত সেই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই।

একা এবং একা এবং একা… ছবি: পিক্সঅ্যাবে

একা! একা! একা! এই নিঃসীম একাকীত্ব! সমাজকে পাশে না পাওয়ার বেদনা— বিপদে একটু অন্তত কথা বলে মন হালকা করার লোকের অভাব (এমনকী, টেলিফোন করলেও ধরার সময়টুকু দিতে পারবে না কেউ) তাড়িয়ে নিয়ে যায় দোকার দিকে। অন্তত একজন তো রয়েছে! হোক না সে পোমেরানিয়ান বা ম্যাস্টিফ বা পারস্যদেশীয় মহার্ঘ্য মার্জার। কথা না বলতে পারুক, শব্দ তো করবে। অনন্ত  নৈঃশব্দ্য তো  চেপে বসবে না বুকের উপরে পাথরের মতো। মনোবিকলন ঘটাবে না। হাসবেন না, ‘বিদেশি রোগ’ বলে নিস্পৃহ থাকার ও চেষ্টা করবেন না। `কেউ না থাকে পরোয়া করি না ভুলুসোনা (পোষ্য সারমেয়) আছে’— ধরনের মিম-এ কি ছেয়ে যাচ্ছে না ভারতীয় (বাঙালি) যৌবনের ফেসবুকের ওয়াল?

জুড়ি বাঁধা, অতএব, আবেগের প্রকাশমাত্র নয় আর, বরং অস্তিত্বের দায়। তাই একা থাকা আজ অযোগ্যতার পরিচায়ক। ‘ওমলেটও ডাবল ডিমের হয়, তুই-ই সিঙ্গল শুধু’- এ মিম তাই আজকের যৌবনের কাছে সবথেকে বড়ো অপমান।

আমাদের একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা, ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা আমরা তাই মাঝ-ফেব্রুয়ারি তে সপ্তাহভর পালন করি।

Releated Post